Logo

রুকইয়াহর বর্তমান প্রয়োগ: কোরআন ও হাদিসের আলোকে আধুনিক প্রেক্ষাপট

ফাতিহা ফালাক ডেস্ক
প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০২৫, ১২: ৪৬
নামাজ মুসলিম জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

রুকইয়াহ শারইয়্যাহ হলো কোরআনের আয়াত এবং হাদিসে বর্ণিত দোয়ার মাধ্যমে জ্বিন, জাদু, বদনজর এবং শারীরিক-মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসার শরিয়াহসম্মত পদ্ধতি। ইসলামের প্রথম যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগেও রুকইয়াহর প্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে। আধুনিক সমাজে জ্বিনের প্রভাব, জাদু, বদনজর এবং মানসিক সমস্যার বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে রুকইয়াহ একটি কার্যকর আধ্যাত্মিক সমাধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই নিবন্ধে রুকইয়াহর বর্তমান প্রয়োগ, এর পদ্ধতি, চ্যালেঞ্জ এবং তাৎপর্য বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

রুকইয়াহর বর্তমান প্রয়োগ

আধুনিক যুগে রুকইয়াহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হচ্ছে। নিম্নে এর প্রধান প্রয়োগগুলো বর্ণনা করা হলো:

  1. জ্বিনের প্রভাব নিরাময়
    • প্রেক্ষাপট: আধুনিক সমাজে জ্বিনের আসর বা প্রভাবের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে অস্বাভাবিক আচরণ, ভয়, দুঃস্বপ্ন বা শারীরিক অসুস্থতার সম্মুখীন হন, যা জ্বিনের প্রভাবের কারণে হতে পারে।
    • প্রয়োগ: রুকইয়াহর মাধ্যমে সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সুরা বাকারার প্রথম ও শেষ আয়াত, সুরা ইখলাস, ফালাক এবং নাস পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া হয়। হাদিসে বর্ণিত, রাসুল (সা.) জ্বিনের প্রভাব থেকে মুক্তির জন্য সুরা বাকারা পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। (মুসলিম, হাদিস : ৮০৪)।
    • উদাহরণ: বর্তমানে অনেক রুকইয়াহ বিশেষজ্ঞ কোরআনের আয়াত পড়ে জ্বিনের প্রভাবে ।

আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা

  • প্রেক্ষাপট: জ্বিনের প্রভাবে অস্বাভাবিক আচরণ, দুঃস্বপ্ন, অব্যাখ্যাত ভয় বা শারীরিক অসুস্থতার সম্মুখীন ব্যক্তিরা রুকইয়াহর মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
  • প্রয়োগ: সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সুরা বাকারার প্রথম ও শেষ আয়াত, সুরা ইখলাস, ফালাক এবং নাস পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া হয়। পানিতে আয়াত পড়ে ফুঁ দিয়ে তা পান করানো বা গোসল করানো একটি প্রচলিত পদ্ধতি।
  • উদাহরণ: রুকইয়াহ বিশেষজ্ঞরা জ্বিন-আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়া পড়ে চিকিৎসা করেন।
  1. জাদু (সিহর) নিরাময়
    • প্রেক্ষাপট: জাদু একটি প্রাচীন সমস্যা, যা আধুনিক যুগেও প্রচলিত। জাদুর কারণে দাম্পত্য কলহ, ব্যবসায়িক ক্ষতি বা অসুস্থতা দেখা দেয়। রাসুল (সা.) জাদু থেকে মুক্তির জন্য সুরা ফালাক ও নাস পড়েছিলেন। (বুখারি, হাদিস : ৫৭৬৫)।
    • প্রয়োগ: জাদু নিরাময়ে সুরা বাকারার আয়াত ১০২, সুরা আরাফের আয়াত ১১৭-১২২ এবং সুরা ফালাক ও নাস পড়া হয়। পানি বা জায়তুন তেলে ফুঁ দিয়ে তা ব্যবহার করা হয়।
    • উদাহরণ: জাদুর প্রভাবে পারিবারিক সমস্যা বা মানসিক অস্থিরতার ক্ষেত্রে রুকইয়াহ বিশেষজ্ঞরা আয়াত পড়ে চিকিৎসা করেন।
  1. বদনজর থেকে সুরক্ষা
    • প্রেক্ষাপট: বদনজর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, “বদনজর সত্য।” (ইবন মাজাহ, হাদিস : ৩৫১০)।
    • প্রয়োগ: বদনজরের জন্য সুরা ফালাক, নাস এবং আয়াতুল কুরসি পড়া হয়। রাসুল (সা.)-এর শেখানো দোয়া: “আউজু বি-কালিমাতিল্লাহিত তাম্মাহ...” পড়া হয়। (বুখারি, হাদিস : ৩৩৭১)।
    • উদাহরণ: শিশুদের অসুস্থতা বা অস্বাভাবিক আচরণে রুকইয়াহ করা হয়। সকাল-সন্ধ্যার জিকির এটি প্রতিরোধ করে।
  1. মানসিক ও শারীরিক রোগের চিকিৎসা
    • প্রেক্ষাপট: মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা অব্যাখ্যাত রোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। কোরআন শিফার উৎস। (ইবন মাজাহ, হাদিস : ৩৫৪৯)।
    • প্রয়োগ: সুরা ফাতিহা, সুরা বাকারার শেষ আয়াত এবং দোয়া পড়ে ফুঁ দেওয়া হয়।
    • উদাহরণ: মাথাব্যথা, ঘুমের সমস্যা বা মানসিক অস্থিরতার জন্য রুকইয়াহ কেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
  1. পারিবারিক ও সামাজিক শান্তি
    • প্রেক্ষাপট: জ্বিন বা জাদুর কারণে পারিবারিক কলহ বা অশান্তি হতে পারে।
    • প্রয়োগ: সুরা বাকারা পড়া বাড়িতে শান্তি আনে। (মুসলিম, হাদিস : ৮০৪)।
    • উদাহরণ: দাম্পত্য সমস্যা সমাধানে বাড়িতে নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করা হয়।

রুকইয়াহর বর্তমান পদ্ধতি

বর্তমানে শরিয়াহসম্মত রুকইয়াহ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়:

  1. কোরআন তিলাওয়াত: সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সুরা ইখলাস, ফালাক, নাস।
  2. হাদিসের দোয়া: “আল্লাহুম্মা রব্বান নাস” বা অন্যান্য দোয়া।
  3. পানি, তেল বা মধুতে ফুঁ দেওয়া: আয়াত পড়ে পানি, জায়তুন তেল বা মধুতে ফুঁ দেওয়া।
  4. ব্যক্তিগত রুকইয়াহ: নিজে পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া।
  5. বিশেষজ্ঞের সহায়তা: শরিয়াহসম্মত বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে চিকিৎসা।

রুকইয়াহর চ্যালেঞ্জ

  1. শিরক ও বিদআত: তাবিজ বা অশুদ্ধ দোয়া ব্যবহার শিরকের দিকে নিয়ে যায়। (আহমদ, হাদিস : ১৭৪৫৮)।
  2. অজ্ঞতা: সঠিক পদ্ধতির অভাবে প্রতারণার শিকার হওয়া।
  3. বিজ্ঞানের প্রতি অবিশ্বাস: চিকিৎসা বিজ্ঞানকে উপেক্ষা করা। (বুখারি, হাদিস : ৫৬৮০)।
  4. অতিরঞ্জন: সব সমস্যাকে জ্বিন বা জাদুর সঙ্গে যুক্ত করা।

রুকইয়াহর তাৎপর্য

  1. আধ্যাত্মিক শক্তি: তাওহিদের প্রতি দৃঢ়তা।
  2. মানসিক শান্তি: উদ্বেগ ও চাপ কমায়।
  3. সামাজিক সমাধান: পারিবারিক ও সামাজিক শান্তি।
  4. বিজ্ঞানের সমন্বয়: সামগ্রিক সুস্থতা।

রুকইয়াহর প্রচলন

  • রুকইয়াহ কেন্দ্র: মুসলিম দেশে শরিয়াহসম্মত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত।
  • অনলাইন প্ল্যাটফর্ম: ইউটিউব ও ফেসবুকে রুকইয়াহ অডিও-ভিডিও।
  • ব্যক্তিগত আমল: নিজে রুকইয়াহ শিখে প্রয়োগ।

উপসংহার

রুকইয়াহ আধুনিক সমাজে জ্বিন, জাদু, বদনজর এবং মানসিক-শারীরিক সমস্যার সমাধানে কার্যকর। শরিয়াহসম্মত পদ্ধতি ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের সমন্বয়ে রুকইয়াহ শিফা ও শান্তি আনে। আল্লাহর কালাম ও খাঁটি নিয়তের মাধ্যমে এটি আধুনিক যুগে একটি অপরিহার্য আধ্যাত্মিক সমাধান।

বিষয়: